Wednesday, March 25, 2026

আগামীর চোখ (Bengali Short Story)

 

আগামীর চোখ

রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। ঢাকার ব্যস্ততা একটু কমেছে, কিন্তু পুরোপুরি থামেনি। রাস্তার বাতিগুলো ঝিমঝিম করছে, আর দূরে কোথাও হর্নের শব্দ ভেসে আসছে।

রায়হান বাসার ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।

হঠাৎ—

একটা ঝলক।

এক সেকেন্ড।

দুই সেকেন্ড।

তার সামনে সবকিছু বদলে গেল।

সে দেখল—রাস্তার মোড়ে একটা কালো প্রাইভেট কার দ্রুতগতিতে আসছে, আর এক ভ্যানচালক রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করছে। পরের মুহূর্তেই ধাক্কা

রায়হান হাঁপিয়ে উঠল।

দৃশ্যটা মিলিয়ে গেল।

সবকিছু আবার আগের মতো।

“আবার…” সে ফিসফিস করে বলল।

এটা নতুন কিছু না।

গত ছয় মাস ধরে সে এই অদ্ভুত ক্ষমতাটা পেয়েছে—সে কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট আগের ভবিষ্যৎ দেখতে পারে।

প্রথমে সে ভয় পেয়েছিল।

তারপর ধীরে ধীরে… অভ্যস্ত হয়ে গেছে।

কিন্তু আজকের দৃশ্যটা অন্যরকম।

কারণ—

এটা এখনো ঘটেনি।


রায়হান ছুটে নিচে নেমে গেল।

“এই রাতে কোথায় যাচ্ছ?” তার মা রান্নাঘর থেকে ডাক দিলেন।

“একটু কাজ আছে!” বলে সে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।

রাস্তার মোড়ে পৌঁছাতে তার তিন মিনিট লাগল।

সে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকাল।

সবকিছু স্বাভাবিক।

কোনো দুর্ঘটনা নেই।

কোনো কালো গাড়ি নেই।

“হয়তো…” সে ভাবল, “আজ ভুল দেখেছি?”

ঠিক তখন—

দূর থেকে একটা গাড়ির হেডলাইট দেখা গেল।

কালো।

দ্রুত আসছে।

রায়হানের বুক ধকধক করতে লাগল।

সে রাস্তার দিকে তাকাল।

একজন ভ্যানচালক ধীরে ধীরে রাস্তা পার হচ্ছে।

ঠিক যেমন সে দেখেছিল।

“এই! দাঁড়াও!” রায়হান চিৎকার করল।

কিন্তু ভ্যানচালক শুনতে পেল না।

গাড়িটা আরও কাছে চলে এসেছে।

সময় খুব কম।

রায়হান দৌড়ে গিয়ে ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে গেল।

“কী করতেছো ভাই?” ভ্যানচালক অবাক হয়ে বলল।

“পিছনে যান! এখনই!”

গাড়ির ব্রেকের শব্দ—

চিঁইইইইইইইইক!

গাড়িটা রায়হানের থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে থেমে গেল।

ড্রাইভার জানালা খুলে চিৎকার করল, “পাগল নাকি?! মরতে চান?!”

রায়হান হাঁপাতে হাঁপাতে দাঁড়িয়ে রইল।

সে জানে—

সে যদি না আসত…

আজ একটা দুর্ঘটনা ঘটত।


পরের দিন সকাল।

রায়হান চায়ের দোকানে বসে ছিল তার বন্ধু সজলের সাথে।

“তুই আবার হিরো হয়ে গেছিস?” সজল হাসতে হাসতে বলল।

“আমি সিরিয়াস,” রায়হান বলল। “আমি আগে থেকেই দেখেছি।”

সজল মাথা নেড়ে বলল, “তুই বেশি সিনেমা দেখিস।”

“আমি সত্যি বলছি!”

“আচ্ছা ঠিক আছে,” সজল মজা করে বলল, “তাহলে বল তো—আমি এখন কী করব?”

রায়হান চুপ করে রইল।

কিছুই দেখছে না।

“দেখলি?” সজল হেসে উঠল। “কিছুই না।”

ঠিক তখন—

একটা ঝলক।

রায়হান দেখল—সজল চায়ের কাপ তুলবে, হাত ফসকে পড়ে যাবে, আর গরম চা তার পায়ে পড়বে।

“ধর!” রায়হান হঠাৎ চিৎকার করল।

“কী—”

সজল কাপটা শক্ত করে ধরে ফেলল।

কাপটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

“এইটা কীভাবে—?” সজল থেমে গেল।

রায়হান ধীরে ধীরে বলল, “আমি দেখেছিলাম।”

সজলের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

“তুই সিরিয়াস?”

“হ্যাঁ।”

একটু চুপ।

তারপর সজল বলল, “এইটা যদি সত্যি হয়… তাহলে ব্যাপারটা বড়।”

রায়হান মাথা নেড়ে বলল, “আমি জানি।”


কয়েকদিন সবকিছু শান্ত ছিল।

রায়হান ছোটখাটো ঘটনা এড়িয়ে চলছিল—বাস মিস না করা, ভুল পথে না যাওয়া, এমনকি বৃষ্টির আগে ছাতা নিয়ে বের হওয়া।

জীবনটা সহজ হয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু—

সহজ জিনিসগুলো কখনো বেশি দিন সহজ থাকে না।


এক সন্ধ্যায়, রায়হান বাসায় ফিরছিল।

রাস্তা প্রায় ফাঁকা।

হঠাৎ—

একটা ভয়ংকর ঝলক।

এইবারটা অনেক বড়।

সে দেখল—

একটা গুদামঘর।

ভেতরে কিছু লোক।

তাদের হাতে অস্ত্র।

আর—

সে নিজে।

বাঁধা।

মুখে রক্ত।

একজন লোক বলছে, “তুই বেশি জানিস।”

তারপর—

অন্ধকার।


রায়হান থমকে দাঁড়াল।

“না… এটা না…” সে কাঁপা গলায় বলল।

এটা শুধু ছোটখাটো দুর্ঘটনা না।

এটা বিপদ।

বড় বিপদ।


সে দ্রুত চারপাশে তাকাল।

সবকিছু স্বাভাবিক।

কিন্তু সে জানে—

এইটা ঘটবে।

প্রশ্ন হলো—

কখন?


পরের কয়েক ঘণ্টা সে বাসা থেকে বের হয়নি।

কিন্তু মাথার ভেতর বারবার সেই দৃশ্যটা ফিরে আসছে।

গুদামঘর।

অস্ত্র।

অচেনা লোক।

“আমি কীভাবে সেখানে গেলাম?” সে নিজেকে জিজ্ঞেস করল।

আরেকটা ঝলক।

সে দেখল—

একজন অচেনা লোক তার কাছে এসে বলছে, “ভাই, একটু সাহায্য করবেন?”

তারপর—

সব শুরু।


রায়হান গভীর শ্বাস নিল।

“ঠিক আছে,” সে বলল। “এইবার আমি প্রস্তুত থাকব।”


পরের দিন।

সে ইচ্ছা করেই বাইরে বের হলো।

কারণ সে জানে—

ঘটনাটা এড়ানো যাবে না।

কিন্তু পরিবর্তন করা যাবে।


রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল সে।

কিছুক্ষণ পর—

ঠিক যেমন সে দেখেছিল—

একজন লোক তার কাছে এল।

“ভাই, একটু সাহায্য করবেন?”

রায়হান লোকটার দিকে তাকাল।

মনে মনে ভবিষ্যৎ দেখার চেষ্টা করল।

ঝলক।

সে দেখল—

লোকটা তাকে একটা ভ্যানের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

ভ্যানের ভেতরে আরও লোক।

ফাঁদ।


রায়হান হালকা হাসল।

“কী সাহায্য?” সে জিজ্ঞেস করল।

লোকটা বলল, “একটু জিনিস উঠাতে হবে—ওই ভ্যানে।”

রায়হান মাথা নেড়ে বলল, “চলুন।”

লোকটা অবাক হলো না।

কারণ—

সবকিছু ঠিকঠাকই চলছে।

তার পরিকল্পনা অনুযায়ী।

কিন্তু—

রায়হানেরও একটা পরিকল্পনা আছে।


ভ্যানের কাছে পৌঁছানোর আগে—

রায়হান আরেকটা ঝলক দেখল।

সে দেখল—

পাঁচ সেকেন্ড পরে, ভ্যানের দরজা খুলবে, ভেতরের লোকেরা তাকে টানবে।


“এই!” রাফি হঠাৎ চিৎকার করল।

লোকটা চমকে উঠল।

“কী—?”

“ওই দেখেন!” রায়হান অন্যদিকে ইশারা করল।

লোকটা ঘুরে তাকাল।

ঠিক সেই মুহূর্তে—

রায়হান দৌড় দিল।


পেছন থেকে চিৎকার—

“ধর ওকে!”

রায়হান দৌড়াতে লাগল।

তার মাথায় একের পর এক ঝলক আসছে—

বাঁদিকে গেলে ধরা পড়বে।

ডানদিকে গেলে খোলা রাস্তা।

সে ডানদিকে ঘুরল।


একটা গলি।

আরেকটা মোড়।

আরেকটা ঝলক—

সামনে পুলিশ।


রায়হান গলির শেষে গিয়ে চিৎকার করল, “স্যার! ওরা—!”

পেছনের লোকগুলো থেমে গেল।

পালিয়ে গেল।


সবকিছু থেমে গেল।

নিঃশ্বাস ফেলার সময় পেল সে।


পুলিশ তাকে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”

রায়হান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর হালকা হেসে বলল, “ভবিষ্যৎটা একটু আগে দেখে ফেলেছিলাম।”

পুলিশ অবাক হয়ে তাকাল।

“কী?”

রায়হান মাথা নেড়ে বলল, “লম্বা গল্প।”


সেদিন রাতে, রায়হান আবার ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।

আকাশ আগের মতোই।

কিন্তু সে বদলে গেছে।

সে জানে—

তার এই ক্ষমতা শুধু সুবিধা না।

এটা দায়িত্বও।

কারণ—

ভবিষ্যৎ দেখা যায়।

কিন্তু সেটাকে বদলানোর সাহস সবার থাকে না।

রায়হান আকাশের দিকে তাকিয়ে হালকা করে বলল—

“যা আসবে… এবার আমি প্রস্তুত।”

No comments:

Post a Comment

রায়ানের আলো (Short Story by Tahsin)

রায়ানের আলো ঢাকার বিকেলের হালকা রোদ ল্যাবের কাচের জানালা দিয়ে প্রবেশ করছে। সার্কিট, ওসিলোস্কোপ আর বৈদ্যুতিক যন্ত্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে রা...